ভোরের আলো ফোটার আগেই কেন বাড়ে হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি?

  • জুন ২, ২০২৬
  • 1 min read
ভোরের আলো ফোটার আগেই কেন বাড়ে হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি?

বিশ্বজুড়ে নীরব ঘাতক হিসেবে পরিচিত হৃদ্‌রোগের প্রকোপ বাংলাদেশেও আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। তবে চিকিৎসকদের সাম্প্রতিকতম পর্যবেক্ষণ ও চিকিৎসা-বিজ্ঞানের গবেষণায় দেখা গেছে, দিনের অন্য যেকোনো সময়ের তুলনায় ভোর থেকে সকালের মধ্যবর্তী সময়ে হার্ট অ্যাটাকের ঘটনা বেশি ঘটে। এটি কেবল কোনো কাকতালীয় ঘটনা নয়, বরং এর পেছনে রয়েছে স্পষ্ট জৈবিক ও বৈজ্ঞানিক কারণ।

কেন সকালের সময়টাই বেশি ঝুঁকিপূর্ণ?

হৃদ্‌রোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, মানুষের শরীরের ভেতরে একটি নিজস্ব ঘড়ি রয়েছে, যাকে চিকিৎসা পরিভাষায় ‘সার্কাডিয়ান রিদম’ বা বায়োলজিক্যাল ক্লক বলা হয়। এই ঘড়ির নিয়ম মেনেই চব্বিশ ঘণ্টায় মানবদেহের হরমোন নিঃসরণ, রক্তচাপ এবং হৃৎস্পন্দনের গতি ওঠানামা করে। ভোরবেলা যখন মানুষ ঘুম থেকে ওঠার প্রস্তুতি নেয়, তখন শরীরকে সচল করতে কিছু হরমোনের ক্ষরণ প্রাকৃতিকভাবেই বেড়ে যায়।

চিকিৎসা বিজ্ঞানের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, সকাল ৬টা থেকে দুপুরের মধ্যে মানবদেহে ‘কর্টিসল’ এবং ‘অ্যাড্রেনালিন’ হরমোনের নিঃসরণ সবচেয়ে বেশি হয়। এই হরমোনগুলো রক্তচাপ বৃদ্ধি করে এবং হৃৎস্পন্দনের গতি বাড়িয়ে দেয়। একই সময়ে শরীরের রক্তনালীগুলো কিছুটা সংকুচিত থাকে। ফলে হৃৎপিণ্ডে রক্ত সঞ্চালনের জন্য বাড়তি অক্সিজেনের প্রয়োজন হয়, যা দুর্বল হার্টের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে।

তাছাড়া, দীর্ঘ সময় ঘুমের পর সকালে রক্তের প্লাটিলেট বা অণুচক্রিকাগুলো বেশি আঠালো থাকে। রক্ত জমাট বাঁধার এই স্বাভাবিক প্রবণতার কারণে ধমনীতে ব্লক বা বাধা তৈরি হওয়া সহজ হয়। যদি কোনো ব্যক্তির হৃদযন্ত্রের ধমনীতে আগে থেকেই চর্বি জমে থাকে, তবে সকালের এই শারীরিক পরিবর্তনের ধাক্কায় রক্ত চলাচল আচমকা বন্ধ হয়ে হার্ট অ্যাটাক ঘটে।

মূল কারণ ও ঝুঁকিপূর্ণ উপাদানসমূহ

মেডিকেল জার্নালগুলোর বিভিন্ন সমীক্ষা এবং কার্ডিওলজিস্টদের মতামত বিশ্লেষণ করে সকালের এই ঝুঁকির পেছনে প্রধান কিছু নিয়ামক চিহ্নিত করা গেছে:

  • রক্তচাপের আকস্মিক বৃদ্ধি (Morning Surge): ঘুমের সময় রক্তচাপ স্বাভাবিকভাবেই কম থাকে, কিন্তু জাগার ঠিক পরপরই তা দ্রুত গতিতে বাড়তে শুরু করে, যা ধমনীর দেয়ালে তীব্র চাপ সৃষ্টি করে।

  • হৃদযন্ত্রের বাড়তি অক্সিজেনের চাহিদা: সকালের দিকে শরীরের বিপাকীয় ক্রিয়া সচল করতে হৃদপিণ্ডকে বেশি কাজ করতে হয়, ফলে অক্সিজেনের ঘাটতি দেখা দিতে পারে।

  • ডিহাইড্রেশন বা পানিশূন্যতা: রাতে দীর্ঘ সময় পানি না খাওয়ার ফলে সকালে রক্ত কিছুটা ঘন থাকে, যা ক্লট বা রক্ত জমাট বাঁধার ঝুঁকি বাড়ায়।

লক্ষণ ও তাৎক্ষণিক করণীয়

সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর যদি বুকে ভারী চাপ, তীব্র ব্যথা যা বাম হাত, ঘাড় বা চোয়ালে ছড়িয়ে পড়ে, অস্বাভাবিক ঘাম এবং শ্বাসকষ্ট দেখা দেয়—তবে তা অবহেলা করা যাবে না। অনেক সময় রোগীরা একে সাধারণ গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা ভেবে ভুল করেন এবং মূল্যবান সময় নষ্ট করেন। চিকিৎসকদের মতে, লক্ষণ প্রকাশের প্রথম এক ঘণ্টাকে ‘গোল্ডেন আওয়ার’ বলা হয়। এই সময়ের মধ্যে রোগীকে নিকটস্থ হাসপাতালে নিয়ে সিসিইউ (CCU) সুবিধায় চিকিৎসা শুরু করতে পারলে জীবন রক্ষা করা সম্ভব।

বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দেন, যারা উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস বা উচ্চ কোলেস্টেরলের সমস্যায় ভুগছেন, তাদের সকালের দিকে অতিরিক্ত শারীরিক পরিশ্রম বা আচমকা ভারী ব্যায়াম করা থেকে বিরত থাকা উচিত। ঘুম থেকে উঠেই তাড়াহুড়ো না করে বিছানায় কিছুক্ষণ জিরিয়ে নেওয়া ভালো।

আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান বলছে, জীবনযাত্রার পরিবর্তন এবং সঠিক সময়ে ওষুধ সেবনের মাধ্যমে সকালের এই নীরব বিপর্যয় অনেকটাই রুখে দেওয়া সম্ভব। শরীর ও প্রকৃতির ভেতরের এই বিজ্ঞানকে বুঝতে পারলেই অকালমৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা পাবে বহু মূল্যবান প্রাণ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *